.8dc21a48.png)
পবিত্র ওমরাহ পালন করা প্রতিটি মুসলিমের জন্য অত্যন্ত আনন্দের ও সৌভাগ্যের বিষয়। যারা জীবনে প্রথমবার আল্লাহর ঘর জিয়ারতের উদ্দেশ্যে মক্কা ও মদিনার পবিত্র ভূমিতে পা রাখতে যাচ্ছেন, তাদের মনের ভেতর একাধারে তীব্র আকুতি এবং কিছুটা অজানা ভয় কাজ করা স্বাভাবিক। অন্য একটি দেশ, ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন সংস্কৃতি এবং সর্বোপরি ইবাদতের নিখুঁত নিয়মাবলী—সবকিছু মিলিয়ে প্রথমবার ওমরাহ করতে যাওয়ার আগে একটি পূর্ণাঙ্গ গাইডলাইন জানা থাকলে পুরো সফরটি অনেক সহজ, সাবলীল ও ত্রুটিমুক্ত হয়। নিচে প্রথমবার ওমরাহ পালনকারীদের জন্য ১০টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বাস্তবসম্মত টিপস আলোচনা করা হলো:
ওমরাহ সফরের সাফল্যের বড় অংশ নির্ভর করে আপনি কোন ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে যাচ্ছেন তার ওপর। বাজারে অনেক সস্তা বা নামসর্বস্ব প্যাকেজ দেখা যায়, যেগুলোতে বুকিং করে হাজিরা সৌদি আরবে গিয়ে চরম ভোগান্তির শিকার হন।
এজেন্সির পূর্বের কাস্টমারদের রিভিউ বা ট্র্যাক রেকর্ড কেমন তা জানুন।
মক্কা ও মদিনার হোটেলগুলো হারাম শরীফ থেকে ঠিক কত মিটার দূরে, তা গুগলে বা এজেন্সির সাথে স্পষ্টভাবে নিশ্চিত হয়ে নিন।
শেয়ারিং রুমে কতজন থাকবেন এবং প্রতিদিনের খাবারে বাঙালি মেন্যু থাকবে কি না, তা বুকিংয়ের আগেই লিখিতভাবে বুঝে নিন।
বাংলাদেশ থেকে বেশিরভাগ ফ্লাইট সরাসরি জেদ্দা বিমানবন্দরে অবতরণ করে। জেদ্দায় নামার পর আর ইহরাম বাঁধার সুযোগ থাকে না, কারণ মিকাত বা ইহরামের নির্ধারিত সীমানা বিমানে থাকা অবস্থাতেই পার হয়ে যায়।
ফ্লাইটের আগে ইহরাম: আপনি ঢাকা বিমানবন্দর থেকেই ইহরামের কাপড় পরে নিয়ত করে নিতে পারেন, অথবা বিমানে যখন মিকাত অতিক্রমের ঘোষণা দেওয়া হবে, তখন দ্রুত নিয়ত ও তালবিয়া পড়তে পারেন। তবে ঢাকা বিমানবন্দর থেকেই ইহরাম পরে নেওয়া সবচেয়ে নিরাপদ।
নিষিদ্ধ কাজগুলো মনে রাখা: ইহরাম বাঁধার পর থেকে ওমরাহর তওয়াফ ও সাঈ শেষ করে চুল কাটার পূর্ব পর্যন্ত কোনো প্রকার সুগন্ধি সাবান বা তেল ব্যবহার করা, নখ-চুল কাটা, মাথা ঢাকা (পুরুষদের জন্য) এবং কোনো জীবজন্তু শিকার বা ক্ষতি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
আপনার বড় ট্রলি বা লাগেজটি বিমানের কার্গোতে চলে যাবে এবং জেদ্দায় নেমে লাগেজ হাতে পেতে ২ থেকে ৩ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে। তাই একটি ছোট পিঠের ব্যাগ বা হ্যান্ড ব্যাগে নিজের অতি প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো রাখা অত্যন্ত জরুরি।
মূল পাসপোর্ট, ওমরাহ ভিসা এবং এয়ার টিকিটের ২ কপি প্রিন্ট।
আপনার ওমরাহ এজেন্সির সৌদি আরবের প্রতিনিধির মোবাইল নম্বর ও হোটেলের কার্ড।
ইহরামের বেল্ট, পকেট জায়নামাজ এবং একটি ছোট দোয়া ও জিকিরের বই।
জরুরি কিছু ওষুধ (গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ, প্যারাসিটামল, খাবার স্যালাইন এবং অ্যান্টি-অ্যালার্জি বা ব্যথানাশক ক্রিম)।
ওমরাহর মূল কাজ অর্থাৎ তওয়াফ এবং সাঈ করার সময় আপনাকে প্রায় ৪ থেকে ৫ কিলোমিটার অনবরত হাঁটতে হবে। এছাড়া হোটেল থেকে হারাম শরীফে যাওয়া-আসার তো রয়েছেই।
নরম স্পঞ্জ বা স্নিকার্স: কোনো ধরনের শক্ত চামড়ার বা নতুন জুতো পরে ওমরাহ করতে যাবেন না, এতে পায়ে ফোসকা পড়ে যেতে পারে। পুরোনো এবং নরম গ্রিপের স্যান্ডেল বা স্নিকার্স ব্যবহার করুন।
জুতো রাখার ব্যাগ: হারাম শরীফের ভেতরে প্রবেশের সময় নিজের জুতো রাখার জন্য একটি ছোট কাপড়ের ব্যাগ সবসময় সাথে রাখুন। জুতো যেখানে-সেখানে রাখলে হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
সৌদি আরবে পৌঁছানোর পর যোগাযোগ এবং সুরক্ষার জন্য একটি স্থানীয় ইন্টারনেট সচল সিম কার্ড নেওয়া অপরিহার্য।
সিম কার্ড সংগ্রহ: জেদ্দা বা মদিনা বিমানবন্দরে নেমেই লাইনে দাঁড়িয়ে STC, Mobily অথবা Zain-এর ওমরাহ সিম কার্ড কিনে নিতে পারেন। এতে আপনার কাছে ইন্টারনেট থাকবে এবং আপনি যেকোনো জায়গায় রাস্তা হারিয়ে ফেললে গুগল ম্যাপের সাহায্য নিতে পারবেন।
Nusuk (নুসুক) অ্যাপ: সৌদি হজ ও ওমরাহ মন্ত্রণালয়ের অফিসিয়াল অ্যাপ 'Nusuk' আপনার মোবাইলে ইনস্টল করে আইডি ভেরিফাই করে নিন। পবিত্র মদিনার রিয়াজুল জান্নাহ বা রাওজা শরীফে প্রবেশের জন্য এই অ্যাপের মাধ্যমে আগে থেকেই পারমিট বা স্লট বুকিং করা বাধ্যতামূলক।
সৌদি আরবের শুষ্ক ও গরম আবহাওয়ায় এবং ইহরাম অবস্থায় অন্তর্বাস (Underwear) পরার নিয়ম না থাকায়, পুরুষ হাজিদের অনবরত হাঁটার কারণে উরুর ভেতরের অংশে মারাত্মক ঘষা লাগে বা চামড়া ছিলে যায় (Chafing)। এর ফলে পরবর্তীতে হাঁটাচলা করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। তাই ইহরাম বাঁধার আগেই উরুর সন্ধিস্থলে ভালো করে ভ্যাসলিন বা অ্যান্টি-র্যাশ ক্রিম মেখে নিন। এটি আপনাকে হাঁটার সময় আরাম দেবে।
মরুভূমির আবহাওয়ার কারণে খুব দ্রুত শরীর থেকে পানি বের হয়ে যায়। নিজেকে ক্লান্তি ও পানিশূন্যতা থেকে রক্ষা করতে প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণে পানি পান করুন। আলহামদুলিল্লাহ, হারাম শরীফের ভেতরে সর্বত্র ঠান্ডা এবং সাধারণ তাপমাত্রার পবিত্র জমজমের পানির ড্রাম ও গ্লাস রাখা থাকে। ইবাদতের ফাঁকে ফাঁকে বেশি বেশি জমজমের পানি পান করুন এবং নিজের ও পরিবারের সুস্থতার জন্য দোয়া করুন।
মক্কার মসজিদ আল-হারাম এবং মদিনার মসজিদে নববী অত্যন্ত বিশাল। প্রথমবার গিয়ে নিজের হোটেলের দিকে যাওয়ার পথ ভুলে যাওয়া খুব সাধারণ একটি ঘটনা।
আপনি হারাম শরীফের যে গেট দিয়ে প্রবেশ করছেন, সেই গেটের নম্বর এবং নাম (যেমন: কিং আব্দুল আজিজ গেট, কিং ফাহাদ গেট বা বাবুল উমরাহ) ভালোভাবে দেখে রাখুন বা মোবাইলে ছবি তুলে রাখুন।
হোটেলের লবি থেকে হোটেলের নাম, ঠিকানা এবং ফোন নম্বর সম্বলিত কার্ড (Hotel Card) কমপক্ষে ৩টি নিজের মানিব্যাগ বা পকেটে সবসময় রাখুন। রাস্তা হারিয়ে ফেললে যেকোনো ট্যাক্সি ড্রাইভার বা পুলিশকে ওই কার্ড দেখালে তারা আপনাকে হোটেলে পৌঁছে দিতে পারবে।
আজকাল ওমরাহ করতে গিয়ে কাবার সামনে দাঁড়িয়ে সেলফি তোলা, ভিডিও করা বা ফেসবুক লাইভ করার একটি নেতিবাচক প্রবণতা দেখা যায়। এতে ইবাদতের মূল একাগ্রতা, বিনম্রতা এবং হুজুরি কলব নষ্ট হয়ে যায়। মনে রাখবেন, আপনি সেখানে নিজের পাপ মার্জনা করতে এবং আল্লাহর মেহমান হিসেবে হাজিরা দিতে গেছেন। তাই সোশ্যাল মিডিয়া থেকে দূরে থেকে প্রতিটি সেকেন্ড ইবাদত, ইস্তিগফার এবং দুরুদ পাঠে মশগুল থাকুন।
ওমরাহর সফরে আপনার সাথে বিভিন্ন দেশের, বিভিন্ন ভাষার এবং নানা স্বভাবের মানুষের দেখা হবে। কাবার তওয়াফের সময় প্রচণ্ড ভিড়ে কেউ আপনাকে ধাক্কা দিতে পারে, কিংবা হোটেলে লিফটের জন্য দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হতে পারে। এই সমস্ত পরিস্থিতিতে রাগ না করে অত্যন্ত ধৈর্যের পরিচয় দিন। কাউকে কষ্ট দেওয়া যাবে না এবং কেউ কষ্ট দিলে তা আল্লাহর ওয়াস্তে ক্ষমা করে দেওয়ার মানসিকতা রাখুন।