.8dc21a48.png)
হজ ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের মধ্যে অন্যতম একটি মহান এবং আর্থিক ও শারীরিকভাবে কষ্টসাধ্য ইবাদত। জীবনের সমস্ত সঞ্চয় জমা করে এবং মহান আল্লাহর ঘরে হাজিরা দেওয়ার ব্যাকুল আকুতি নিয়ে প্রতি বছর লাখো মুসলিম মক্কা ও মদিনার উদ্দেশ্যে রওনা হন। তবে হজ কোনো সাধারণ আমোদপ্রমোদ বা পর্যটন ভ্রমণ নয়। এটি একটি দীর্ঘ এবং কঠোর পরিশ্রমের আধ্যাত্মিক সফর। সঠিক এবং সুপরিকল্পিত প্রস্তুতির অভাবে অনেক হাজি সাহেবই পবিত্র ভূমিতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন, কিংবা বিভিন্ন আইনি ও ধর্মীয় জটিলতায় ভোগেন। হজের সফরের পূর্ণ ফায়দা এবং "হজ্জে মাবরুর" বা কবুল হজের মর্যাদা লাভ করতে হলে যাত্রা শুরুর অন্তত ৩ থেকে ৪ মাস আগে থেকেই সুনির্দিষ্ট কিছু প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি।
হজ মূলত অন্তরের ইবাদত। বাহ্যিক প্রস্তুতির চেয়ে ভেতরের আত্মশুদ্ধি এখানে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
নিয়ত বা সংকল্প খাঁটি করা: হজে যাওয়ার একমাত্র লক্ষ্য হতে হবে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। সমাজে নিজের সম্মান বাড়ানো, নামের আগে 'আলহাজ্ব' উপাধি যুক্ত করা কিংবা ব্যবসার খাতিরে হজে যাওয়া—এই ধরনের লোকদেখানো (রিয়া) মানসিকতা থেকে অন্তরকে সম্পূর্ণ মুক্ত করতে হবে।
তওবা এবং ক্ষমা প্রার্থনা: হজের সফরে বের হওয়ার আগে জীবনের অতীত সমস্ত গুনাহের জন্য আল্লাহর কাছে খাঁটি মনে তওবা করতে হবে। মানুষের সাথে কোনো অন্যায় বা হাক্কুল ইবাদ (বান্দার হক) নষ্ট করে থাকলে, যার হক তার কাছে গিয়ে ক্ষমা চেয়ে নিতে হবে। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব এবং প্রতিবেশীদের সাথে কোনো মনোমালিন্য থাকলে তা মিটিয়ে বিদায় নেওয়া সুন্নত।
ধৈর্যের চূড়ান্ত পরীক্ষা: হজের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো "ধৈর্য"। মক্কা এবং মদিনায় পৃথিবীর সব দেশ থেকে লাখ লাখ মানুষ একত্রিত হন। বিমানবন্দর, ইমিগ্রেশন, হোটেল চেক-ইন, কিংবা মিনা-আরাফাতের মাঠে আপনার ইচ্ছার বিরুদ্ধে অনেক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। প্রচণ্ড গরম, দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা, বা বাসের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করার মতো পরিস্থিতিতে মেজাজ হারানো যাবে না। ঝগড়া-বিবাদ বা অহেতুক তর্ক-বিতর্ক হজের সওয়াব নষ্ট করে দেয়। তাই যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিতে "আলহামদুলিল্লাহ" বলার মানসিকতা আগে থেকেই তৈরি করুন।
হজের পাঁচটা দিন (৮ থেকে ১২ জিলহজ) প্রচণ্ড শারীরিক পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে যায়। মিনা, আরাফাত, মুজদালিফা এবং জামারাতে পাথর মারার জন্য একজন হাজিকে প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটার, এমনকি কোনো কোনো দিন ২০ কিলোমিটার পর্যন্ত পায়ে হাঁটতে হতে পারে।
হাঁটার নিয়মিত অভ্যাস: হজের ফ্লাইট শুরু হওয়ার অন্তত ৩ মাস আগে থেকে প্রতিদিন নিয়ম করে সকালে অথবা বিকেলে ৪৫ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টা দ্রুত হাঁটার (Brisk Walking) অভ্যাস গড়ে তুলুন। এতে পায়ের পেশি শক্ত হবে এবং মক্কা-মদিনার দীর্ঘ পথ হাঁটার ক্লান্তি সহ্য করার ক্ষমতা তৈরি হবে।
মেডিকেল চেক-আপ ও নিয়মিত ওষুধ: আপনার যদি আগে থেকেই ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হাঁপানি বা হৃদরোগের মতো দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা থাকে, তবে হজে যাওয়ার আগে অবশ্যই আপনার ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করুন। আপনার প্রেসক্রিপশনের একটি কপি এবং হজের পুরো সময়কাল ও তার চেয়েও অতিরিক্ত অন্তত ২০ দিনের প্রয়োজনীয় ওষুধ নিজের সাথে রাখুন। এই ওষুধগুলো সবসময় আপনার হ্যান্ড ব্যাগে (হ্যান্ড ল্যাগেজ) রাখবেন, যাতে মূল লাগেজ পেতে দেরি হলেও ওষুধে কোনো গ্যাপ না পড়ে।
টিকা এবং স্বাস্থ্য সনদ: সৌদি সরকারের নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারিত ইনফ্লুয়েঞ্জা, মেনিনজাইটিস এবং সমসাময়িক অন্যান্য প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য সুরক্ষার টিকাগুলো সময়মতো সরকারি অনুমোদিত কেন্দ্র থেকে দিয়ে নিন এবং কিউআর কোডসহ মূল সার্টিফিকেটটি যত্ন সহকারে ফাইলে রাখুন।
হালাল অর্থ নিশ্চিতকরণ: হজের পুরো খরচের টাকা যেন শতভাগ হালাল উপায়ে উপার্জিত হয়, তা নিশ্চিত করা ফরয। হারাম বা সন্দেহজনক উপার্জনের টাকা দিয়ে হজ করলে ইবাদত কবুল হওয়ার কোনো সুযোগ থাকে না।
ঋণ ও অসিয়তনামা: হজে যাওয়ার আগে নিজের সমস্ত দেনা-পাওনা পরিশোধ করুন। যদি কোনো দীর্ঘমেয়াদী ঋণ থাকে, তবে তা পরিবারের কোনো দায়িত্বশীল সদস্যকে জানিয়ে যান এবং কীভাবে তা পরিশোধ করা হবে তার একটি লিখিত দলিল বা অসিয়তনামা রেখে যাওয়া অত্যন্ত উত্তম।
পাসপোর্ট ও প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস: আপনার পাসপোর্টের মেয়াদ হজের দিন থেকে কমপক্ষে ৬ মাস আছে কি না তা আগেই দেখে নিন। পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র (NID), হজের নিবন্ধনপত্র এবং ছবি—সবকিছুর কয়েক সেট রঙিন ফটোকপি করে আলাদা আলাদা ব্যাগে রাখুন।
না জেনে বা ভুল নিয়মে হজ করলে বড় ধরনের গোনাহ বা দণ্ড (দম বা কোরবানি) দিতে হতে পারে।
তালিম ও কর্মশালা: আপনার হজ এজেন্সি বা সরকারি উদ্যোগে যে হজের প্রশিক্ষণ বা তালিমের আয়োজন করা হয়, তাতে নিয়মিত অংশগ্রহণ করুন।
বই এবং ডিজিটাল লার্নিং: নির্ভরযোগ্য আলেমদের লেখা হজের ছোট পকেট গাইড বই সাথে রাখুন। বর্তমানে ইউটিউবে থ্রিডি (3D) অ্যানিমেশনের মাধ্যমে ইহরাম বাঁধা, তওয়াফ করা এবং মিনার আমলগুলো খুব সুন্দরভাবে দেখানো হয়, সেগুলো দেখে বাস্তব ধারণা নিতে পারেন।