.8dc21a48.png)
পবিত্র হজ ও ওমরাহ পালনের জন্য যখন কোনো মুমিন বান্দা মক্কা মুকাররমা এবং মদিনাতুল মুনাওয়ারায় গমন করেন, তখন মূল ইবাদতের পাশাপাশি এই দুই পবিত্র নগরীর ঐতিহাসিক স্থানগুলো দর্শন করা বা 'জিয়ারত' করা সফরের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে দাঁড়ায়। মক্কা ও মদিনার প্রতিটি ধূলিকণায়, পাহাড়ে এবং প্রান্তরে জড়িয়ে আছে ইসলামের সূচনা লগ্ন, প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর কঠোর নবুয়তি জীবন-সংগ্রাম এবং সাহাবায়ে কেরামদের ঈমান রক্ষার ও আত্মত্যাগের রক্তঝরা ইতিহাস। কেবল চোখ দিয়ে দেখার জন্য নয়, বরং এই স্থানগুলোর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট জেনে অত্যন্ত আদবের সাথে জিয়ারত করলে একজন মুসলমানের ঈমানী চেতনা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। নিচে মক্কা ও মদিনার প্রধান প্রধান ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থানসমূহের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হলো:
মক্কা নগরীর উত্তর-পূর্বে অবস্থিত একটি সুউচ্চ পাহাড়, যার নাম 'জাবালে নূর' বা আলোর পাহাড়। এই পাহাড়ের ঠিক চূড়ার কাছাকাছি একটি ছোট গুহা রয়েছে, যা 'হেরা গুহা' নামে পরিচিত। আমাদের প্রিয় নবী (সাঃ) নবুয়ত প্রাপ্তির পূর্বে মক্কার জাহেলিয়াত বা পাপাচার থেকে দূরে থাকার জন্য এই নির্জন গুহায় দিনের পর দিন, রাতের পর রাত আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন থাকতেন। এই গুহাতেই উম্মুল মুমিনীন হযরত খাদিজা (রাঃ) নবীজীকে খাবার পৌঁছে দিতেন। অবশেষে এই হেরা গুহায় জিবরাঈল (আঃ)-এর মাধ্যমে পবিত্র কুরআনের প্রথম বাণী—"ইকরা বিইশমি রব্বিকাল্লাজি খালাক" (পড়ুন আপনার রবের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন) নাজিল হয়। পাহাড়টি বেশ খাড়া এবং চূড়ায় উঠতে প্রায় ১ থেকে ২ ঘণ্টা সময় লাগে, যা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য কিন্তু আধ্যাত্মিক দিক থেকে অনন্য।
মক্কা শহরের দক্ষিণ দিকে অবস্থিত আরেকটি ঐতিহাসিক পাহাড় হলো 'জাবালে সাওর'। মহান আল্লাহর নির্দেশে যখন প্রিয় নবী (সাঃ) তাঁর প্রিয় জন্মভূমি মক্কা ছেড়ে মদিনায় হিজরত করছিলেন, তখন মক্কার কাফেররা তাঁকে হত্যার জন্য চারদিকে জাল বিছিয়ে দেয়। কাফেরদের চোখ ফাঁকি দিয়ে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এবং তাঁর পরম বিশ্বস্ত সঙ্গী হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রাঃ) এই পাহাড়ের একটি অন্ধকার গুহায় টানা তিন দিন ও তিন রাত আত্মগোপন করেছিলেন। কাফেররা যখন খুঁজতে খুঁজতে গুহার একদম মুখে এসে দাঁড়িয়েছিল, তখন আল্লাহ তাআলা অলৌকিকভাবে গুহার মুখে মাকড়সার জাল এবং কবুতরের বাসার ব্যবস্থা করে তাদের অন্ধ করে দেন। কুরআনে এই ঘটনার উল্লেখ রয়েছে।
মক্কা থেকে পূর্ব দিকে প্রায় ২২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত একটি বিশাল প্রান্তর, যার নাম 'আরাফাতের ময়দান'। ৯ জিলহজ এই ময়দানে অবস্থান করাই হলো হজের প্রধান রোকন। এই ময়দানের মাঝখানে একটি ছোট পাহাড় রয়েছে, যাকে 'জাবালে রহমত' বা দয়ার পাহাড় বলা হয়। ইসলামের ইতিহাস অনুযায়ী, স্বর্গ থেকে পৃথিবীতে প্রেরণের পর আদি পিতা হযরত আদম (আঃ) এবং আদি মাতা বিবি হাওয়া (আঃ)-এর দীর্ঘ বছরের কান্নাকাটি ও তাওবার পর এই পাহাড়ের কাছেই পুনর্মিলন ঘটেছিল এবং আল্লাহ তাঁদের ক্ষমা করেছিলেন। এছাড়া এই আরাফাতের ময়দানেই প্রিয় নবী (সাঃ) তাঁর জীবনের শেষ হজ অর্থাৎ 'বিদায় হজে' মানবজাতির অধিকার ও সাম্যের ঐতিহাসিক মহাসনদ বা ভাষণ ঘোষণা করেছিলেন।
হজের দিনগুলোতে হাজিদের তাঁবুর নগরী 'মিনা'-তে অবস্থান করতে হয়। মিনার পাশেই রয়েছে মুজদালিফার প্রান্তর, যেখানে হাজিরা খোলা আকাশের নিচে রাত্রিযাপন করেন এবং শয়তানকে মারার জন্য কঙ্কর বা পাথর সংগ্রহ করেন। মিনায় অবস্থিত তিনটি স্তম্ভ বা জামারাতে শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করা হয়। এটি মূলত হযরত ইব্রাহিম (আঃ), হযরত ইসমাইল (আঃ) এবং বিবি হাজেরাকে শয়তান যখন আল্লাহর নির্দেশ পালনে বাধা দিতে চেয়েছিল, তখন তারা যেভাবে শয়তানকে পাথর মেরে তাড়িয়েছিলেন—সেই ঐতিহাসিক ঘটনারই এক চিরন্তন প্রতীকী ইবাদত।
মদিনা শরীফে প্রবেশের মুখে অবস্থিত ইসলামের ইতিহাসের সর্বপ্রথম এবং প্রথম সারির একটি পবিত্র মসজিদ। মক্কা থেকে হিজরত করে মদিনায় পৌঁছানোর পর নবীজী (সাঃ) কুবাবাসীর অনুরোধে এই মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন এবং নিজে সাহাবীদের সাথে পাথর ও কাদা বহন করে এটি নির্মাণ করেন। হাদীস শরীফে এই মসজিদের বিশেষ ফজিলত বর্ণিত হয়েছে; রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, "যে ব্যক্তি নিজের ঘরে ভালোভাবে ওযু করে মসজিদে কুবায় এসে দুই রাকাত নফল সালাত আদায় করবে, সে একটি পূর্ণাঙ্গ ওমরাহর সমপরিমাণ সওয়াব লাভ করবে।"
মদিনার উত্তর প্রান্তে অবস্থিত একটি বিশাল এবং দীর্ঘ লালচে রঙের পাথুরে পাহাড়। হিজরতের তৃতীয় বর্ষে এই পাহাড়ের পাদদেশেই ইসলামের দ্বিতীয় বৃহত্তম এবং অত্যন্ত হৃদয়বিদারক যুদ্ধ 'ওহুদের যুদ্ধ' সংঘটিত হয়েছিল। কাফেরদের সাথে যুদ্ধে মুসলিমদের প্রাথমিক বিজয়ের পর কিছু কৌশলগত ভুলের কারণে পরবর্তীতে মুসলিম বাহিনী বিপর্যয়ের মুখে পড়ে এবং নবীজীর প্রিয় চাচা 'আসাদুল্লাহ' হযরত হামজা (রাঃ) সহ ৭০ জন শ্রেষ্ঠ সাহাবী এখানে শহীদ হন। নবীজী (সাঃ) নিজেও এই যুদ্ধে মারাত্মকভাবে আহত হন এবং তাঁর পবিত্র দন্ত মুবারক শহীদ হয়। ওহুদ পাহাড়ের পাশেই এই ৭০ জন বীর শহীদ সাহাবীদের কবরস্থান রয়েছে, যা 'শুহাদায়ে ওহুদ' নামে পরিচিত। নবীজী (সাঃ) ওহুদ পাহাড়কে অত্যন্ত ভালোবাসতেন।
'কিবলাতাইন' শব্দের অর্থ হলো "দুই কিবলা বিশিষ্ট মসজিদ"। ইসলামের শুরুর দিকে মুসলমানরা জেরুজালেমের 'বাইতুল মুকাদ্দাস' বা মসজিদ আল-আকসার দিকে মুখ করে নামাজ আদায় করতেন। প্রিয় নবী (সাঃ)-এর তীব্র ইচ্ছা ছিল কাবার দিকে কিবলা পরিবর্তন হওয়ার। হিজরতের দ্বিতীয় বর্ষে একদিন আল্লাহর রাসূল (সাঃ) এই মসজিদে যোহরের বা আসরের নামাজ জামাতে পড়াচ্ছিলেন। নামাজের দ্বিতীয় রাকাত শেষে রুকুতে থাকা অবস্থায় মহান আল্লাহর ওহী নাজিল হয়—"আপনার মুখ অবলীল কাবার দিকে ফিরিয়ে নিন।" নামাজ অবস্থাতেই নবীজী (সাঃ) এবং তাঁর পেছনে থাকা সাহাবীরা ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে কাবার দিকে মুখ করে বাকি দুই রাকাত নামাজ শেষ করেন। একই নামাজে দুই কিবলার দিকে মুখ করা হয়েছিল বলেই এই মসজিদকে মসজিদে কিবলাতাইন বলা হয়।
মসজিদে নববীর পূর্ব গেটের ঠিক পাশেই অবস্থিত মদিনার প্রধান এবং সবচেয়ে পবিত্র ঐতিহাসিক কবরস্থান। এই পুণ্যভূমিতে ইসলামের ইতিহাসের প্রথম স্তর থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত হাজার হাজার মহান ব্যক্তিত্ব শায়িত আছেন। প্রিয় নবী (সাঃ)-এর ৩ জন কন্যা, একমাত্র পুত্র হযরত ইব্রাহিম, নবীজীর চাচা হযরত আব্বাস, ইসলামের তৃতীয় খলিফা হযরত উসমান (রাঃ), উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রাঃ)-সহ নবীজীর পবিত্র স্ত্রীগণ এবং প্রায় ১০ হাজারেরও বেশি সাহাবায়ে কেরাম এই কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন। মদিনায় অবস্থানকালে এই কবরস্থানের পাশে দাঁড়িয়ে হাত তুলে তাদের জন্য দোয়া করা অত্যন্ত সওয়াব ও আদবের কাজ।
জিয়ারতকারীদের জন্য বিশেষ পরামর্শ: মক্কা ও মদিনার এই পবিত্র স্থানগুলোতে প্রচণ্ড রোদের কারণে সাথে ছাতা এবং খাবার পানি রাখা জরুরি। প্রতিটি স্থানে যাওয়ার আগে তার সঠিক ইতিহাস কোনো বই বা অভিজ্ঞ গাইডের কাছ থেকে জেনে নিলে দেখার আনন্দ এবং ইবাদতের একাগ্রতা বহুগুণ বেড়ে যায়। কোনোরকম হুড়োহুড়ি বা ছবি তোলার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত না হয়ে স্থানগুলোর পবিত্রতা বজায় রাখা উচিত।